ইসরায়েল চল্লিশ বছর ধরে যেভাবে ইরানে যুদ্ধের ছক কষেছে
· Prothom Alo

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে যে যুদ্ধ শুরু করেছে, তার উদ্দেশ্য ঠিক কী—তাদের দেওয়া ব্যাখ্যা থেকে তা বোঝা প্রায় অসম্ভব।
এটি কি ইরানের কথিত পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি ধ্বংস করার জন্য? অথচ এমন কোনো কর্মসূচির স্পষ্ট প্রমাণ কখনোই পাওয়া যায়নি। কয়েক মাস আগেই ট্রাম্প নিজেই দাবি করেছিলেন, আগের একটি হামলায় তিনি ইরানের সেই কর্মসূচিকে ‘সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস’ করে দিয়েছেন।
Visit asg-reflektory.pl for more information.
তাহলে কি লক্ষ্য ছিল তেহরানকে আবার আলোচনায় ফিরতে বাধ্য করা? কিন্তু যে পারমাণবিক সমঝোতা নিয়ে আলোচনা চলছিল, সেটি ভেঙে যায় ঠিক তখনই, যখন যুক্তরাষ্ট্র কোনো উসকানি ছাড়াই হামলা চালায়। অথবা এমনও কি হতে পারে যে, যুদ্ধের উদ্দেশ্য ছিল ইরানকে চাপ দিয়ে আরও ছাড় আদায় করা? কিন্তু হামলার ঠিক আগমুহূর্তে মধ্যস্থতাকারী ওমান জানিয়েছিল, ওয়াশিংটনের কঠোর প্রায় সব শর্তই তেহরান মেনে নিয়েছে এবং একটি সমঝোতা ‘হাতের নাগালে’ চলে এসেছে।
ইসরায়েলের ভয় ছিল, যদি ইরান উত্তর কোরিয়ার মতো পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করে, তবে মধ্যপ্রাচ্যে পশ্চিমা শক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক মিত্র হিসেবে ইসরায়েলের ভূমিকা দুর্বল হয়ে পড়বে।
তাহলে কি বিমান হামলার লক্ষ্য ছিল ইরানিদের ‘মুক্ত’ করা? কিন্তু হামলার শুরুর দিকেই একটি মেয়েদের স্কুলে অন্তত ১৬৫ জন বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছে, যাদের বেশির ভাগই ছিল ৭ থেকে ১২ বছর বয়সী শিশু। নাকি লক্ষ্য ছিল ইরানকে তার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ত্যাগ করতে বাধ্য করা? অথচ এগুলোই ইরানের একমাত্র প্রতিরোধক্ষমতা। এগুলো ত্যাগ করলে দেশটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্ভাব্য হামলার মুখে সম্পূর্ণ অরক্ষিত হয়ে পড়বে।
ওয়াশিংটন হয়তো ভেবেছিল তেহরানই আগে হামলা চালাতে যাচ্ছে। কিন্তু পেন্টাগনের কর্মকর্তারাই কংগ্রেসের কর্মীদের জানিয়েছেন, এমন কোনো হামলার প্রস্তুতির গোয়েন্দা তথ্য তাদের কাছে ছিল না। নাকি লক্ষ্য ছিল ইরানের শাসনব্যবস্থার শীর্ষ নেতৃত্বকে সরিয়ে দেওয়া? কারণ, হামলায় ইতিমধ্যে নিহত হয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি।
আবার হামলা হলে মরণকামড় দেবে ইরানকিন্তু তাতে কী লাভ? খামেনিই তো পারমাণবিক অস্ত্রের বিরুদ্ধে একটি ধর্মীয় ফতোয়া জারি করেছিলেন। বরং তাঁর উত্তরসূরি হয়তো এখন এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেন যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মতো আন্তর্জাতিক আইনকে তোয়াক্কা না করা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নিজেদের সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করা জরুরি।
ওয়াশিংটনের কাছে থেকে কোনো পরিষ্কার যুক্তি পাওয়া যাচ্ছে না। কারণ, এই হামলার প্রকৃত পরিকল্পনাকারী হোয়াইট হাউস বা পেন্টাগনে নয়। এই পরিকল্পনা বহু আগে থেকেই তৈরি হয়েছিল তেল আবিবে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নিজেই সেটি স্বীকার করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘এই যৌথ অভিযান আমাকে সেই লক্ষ্য অর্জনের সুযোগ দিয়েছে, যার জন্য আমি ৪০ বছর ধরে অপেক্ষা করছি। সেই লক্ষ্য হলো সন্ত্রাসী শাসনব্যবস্থাকে পুরোপুরি ধ্বংস করা।’
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই একই ৪০ বছর ধরে নেতানিয়াহু ও অন্য ইসরায়েলি নেতারা দাবি করে আসছেন, ইরান নাকি কয়েক মাসের মধ্যেই পারমাণবিক বোমা বানিয়ে ফেলবে।
চার দশক ধরে প্রতিবছরই বলা হয়েছে, এ বছরই শেষ সুযোগ ‘উন্মাদ মোল্লাদের’ বোমা তৈরির আগেই থামানোর। কিন্তু সেই বোমা কখনোই বাস্তবে দেখা যায়নি।
এই সময়জুড়ে ইসরায়েলের নিজস্ব পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডার অবশ্য ‘ওপেন সিক্রেট’ হয়ে থেকেছে। দেশটি কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে তা স্বীকার করেনি, ফলে কোনো আন্তর্জাতিক তদারকিও নেই।
ইউরোপ ইসরায়েলকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে সহায়তা করেছিল এবং যুক্তরাষ্ট্র সে সময় চোখ বন্ধ করে রেখেছিল। একই সময়ে ইসরায়েলি নেতারা ‘স্যামসন অপশন’ নামে একটি নীতির কথা বলতেন। এর অর্থ ছিল, যদি ইসরায়েল প্রচলিত যুদ্ধে পরাজয়ের মুখে পড়ে, তবে তারা নিজেদের পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করতেও পিছপা হবে না।
এই নীতির অর্থ হলো, মধ্যপ্রাচ্যের আর কোনো রাষ্ট্রকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে দেওয়া যাবে না। কারণ, তা হলে ইসরায়েলের সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যাবে।
দশকের পর দশক ধরে ইরানের প্রতি ইসরায়েলের নীতি এই ধারণার ওপরই দাঁড়িয়ে আছে।
কারণ, ইরান মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় ও ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্রগুলোর একটি। দেশটির দীর্ঘ ইতিহাস, শক্তিশালী সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং উল্লেখযোগ্য বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্য রয়েছে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, ইরান বারবার দেখিয়েছে যে তারা পশ্চিমা শক্তি বা ইসরায়েলের প্রভাবের কাছে নতি স্বীকার করতে রাজি নয়।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুইরাক, লেবানন, সিরিয়া ও ইয়েমেনের শিয়া সম্প্রদায়ের মধ্যেও ইরানকে নেতৃত্ব ও প্রভাবের উৎস হিসেবে দেখা হয়। এসব অঞ্চলের অনেক গোষ্ঠীও ইসরায়েলের আধিপত্য মানতে রাজি নয়।
ইসরায়েলের ভয় ছিল, যদি ইরান উত্তর কোরিয়ার মতো পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করে, তবে মধ্যপ্রাচ্যে পশ্চিমা শক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক মিত্র হিসেবে ইসরায়েলের ভূমিকা দুর্বল হয়ে পড়বে।
তখন প্রতিবেশী দেশগুলোকে ভয় দেখানো, সাম্প্রদায়িক বিভাজন উসকে দেওয়া এবং অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বিস্তারে সহায়তার মতো ভূমিকাগুলো আর আগের মতো কার্যকর থাকবে না।
তাই ইসরায়েলের নেতৃত্ব কখনোই সহজে এই অবস্থান ছাড়তে রাজি ছিল না।
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের পক্ষে ইসরায়েলের যে যুক্তি, তা কতটা বিভ্রান্তিকর—সেটা বোঝার জন্য ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ইরাক আক্রমণের ঘটনাটি মনে করা যেতে পারে।
সেই সময় যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছিল, ইরাকের নেতা সাদ্দাম হোসেনের কাছে বিপুল পরিমাণ গণবিধ্বংসী অস্ত্র রয়েছে। কিন্তু জাতিসংঘের পরিদর্শকেরা বলেছিলেন, এমন কোনো অস্ত্র থাকার সম্ভাবনা খুবই কম।
পরে ইরাক দখলের পরও এমন কোনো অস্ত্র কখনো পাওয়া যায়নি। তবু পশ্চিমা রাজনীতি ও গণমাধ্যম তখন সেই দাবিকেই সত্য হিসেবে গ্রহণ করেছিল।
ইরানের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও স্পষ্ট। চার দশক ধরে ইসরায়েল একই দাবি করে আসছে। এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে রাজনৈতিক নেতা ও গণমাধ্যমের উচিত ছিল এসব দাবির বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাই করা। কিন্তু তারা তা করেনি।
গাজায় ইসরায়েলের ধ্বংসযজ্ঞ কিংবা ইরাকে আগের দখলদারির মতোই, ইরানের ওপর এই হামলাও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ প্রকল্পের ধারাবাহিকতা।
নেতানিয়াহু বলেন, তিনি ‘সন্ত্রাসী শাসনব্যবস্থা’ ধ্বংস করতে চান। ট্রাম্প বলেন, ইরানকে পরাজিত করা গেলে মধ্যপ্রাচ্য সম্পূর্ণ বদলে যাবে। এসব বক্তব্য বহুদিনের একটি ধারণার পুনরাবৃত্তি—মধ্যপ্রাচ্যকে নতুনভাবে সাজানোর স্বপ্ন।
এই ধারণা যুক্তরাষ্ট্রের নব্য রক্ষণশীল নীতিনির্ধারকদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত। ২০০৬ সালে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী কন্ডোলিসা রাইস বলেছিলেন, নতুন মধ্যপ্রাচ্যের জন্মের আগে অঞ্চলটিকে কিছু ‘যন্ত্রণাদায়ক প্রসববেদনা’ সহ্য করতে হবে। কিন্তু বাস্তবে সেই পরিকল্পনা দ্রুতই ব্যর্থ হয়েছিল।
ইরাকে মার্কিন বাহিনী তীব্র প্রতিরোধের মুখে পড়ে। আফগানিস্তানে তালেবান আবার ক্ষমতা ফিরে পায়। ২০০৬ সালে লেবাননে হিজবুল্লাহ ইসরায়েলকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে। তবু সেই সময়কার যুদ্ধগুলো ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি করেছিল। লাখ লাখ মানুষ নিহত বা বাস্তুচ্যুত হয়েছিল। আন্তর্জাতিক আইন দুর্বল হয়ে পড়েছিল।
আজকের হামলা সেই দীর্ঘ ধারাবাহিকতারই আরেকটি অধ্যায়। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত। ইরান গাজার মতো ছোট ভূখণ্ড নয়। এটি অনেক বড়, শক্তিশালী এবং জটিল একটি রাষ্ট্র। গাজা, ইরাক, লেবানন, সিরিয়া ও ইয়েমেনে যে প্রতিরোধের আগুন এখনো জ্বলছে, ইরানের ওপর এই হামলা সেই আগুনকে আরও উসকে দিতে পারে।
এই যুদ্ধের পরিণতি কী হবে, তা এখনো কেউ নিশ্চিতভাবে বলতে পারে না। কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট—এটি পরিকল্পনা অনুযায়ী চলবে, এমন নিশ্চয়তা কারও কাছেই নেই।
জোনাথন কুক, মার্থা গেলহর্ন স্পেশাল প্রাইজ বিজয়ী লেখক ও বিশ্লেষক
মিডল ইস্ট আই থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত