যাঁকে নিয়ে চলছে দুদকের অনুসন্ধান, তাঁকেই বসানো হলো বিমানের বড় পদে

· Prothom Alo

সরকারি অর্থে সফটওয়্যার কিনে তিন কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়েছিল। তদবির করে সেই মামলা থেকে তিনি অব্যাহতি পেয়ে যান বলে অভিযোগ রয়েছে। বিমান অব্যাহতি দিলেও এ নিয়ে অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তার মধ্যেই বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের সেই মহাব্যবস্থাপক মো. মিজানুর রশীদকে গুরুত্বপূর্ণ একাধিক দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

Visit zeppelin.cool for more information.

বিমানের মহাব্যবস্থাপক (যানবাহন) পদে ছিলেন মিজানুর রশীদ। গত ৪ মার্চ তাঁকে বদলি করা হয় অর্থ ও হিসাব বিভাগে। তার এক দিন পর তাঁকে প্রশাসন ও মানবসম্পদ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক হিসেবে বদলি করা হয়। একই সঙ্গে তাঁকে প্রশাসন ও মানবসম্পদ বিভাগের পরিচালকের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়। পাশাপাশি অর্থ বিভাগের পরিচালকের অতিরিক্ত দায়িত্বও দেওয়া হয় তাঁকে। পরিচালকের পদটি মহাব্যবস্থাপকের চেয়ে উঁচু।

বিমানের যানবাহন বিভাগ মূলত এয়ারপোর্টের অভ্যন্তরে ও বাইরে বিমানের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ক্রুদের যাতায়াত এবং গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের সরঞ্জাম রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনা করে। সেই তুলনায় অর্থ বিভাগ এবং প্রশাসন ও মানবসম্পদ বিভাগের কাজের পরিসর অনেক ব্যাপক। বাজেট প্রণয়ন থেকে শুরু করে ব্যয়, ক্রয় ও আর্থিক অনুমোদনের কাজ অর্থ বিভাগের। নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলির গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তদারক করে প্রশাসন ও মানবসম্পদ বিভাগ।

দুর্নীতির অভিযোগের মুখে থাকা একজনকে গুরুত্বপূর্ণ এতগুলো দায়িত্ব দেওয়ায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন বিমানের কর্মকর্তারা। অভিযোগ রয়েছে, মিজানুরকে গুরুত্বপূর্ণ একাধিক পদের দায়িত্ব দেওয়ার পেছনে বিমানের সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তাদের একটি শক্তিশালী পক্ষ কাজ করেছে। এর মধ্যে একজন অবসরপ্রাপ্ত পরিচালকের নামও আলোচনায় রয়েছে, যিনি নিজেকে একজন মন্ত্রীর আত্মীয় পরিচয় দিয়ে থাকেন বলে বিমানের একাধিক সূত্র জানিয়েছে।

দুর্নীতির অভিযোগের মুখে থাকা একজনকে গুরুত্বপূর্ণ এতগুলো দায়িত্ব দেওয়ায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন বিমানের কর্মকর্তারা। অভিযোগ রয়েছে, মিজানুরকে গুরুত্বপূর্ণ একাধিক পদের দায়িত্ব দেওয়ার পেছনে বিমানের সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তাদের একটি শক্তিশালী পক্ষ কাজ করেছে। এর মধ্যে একজন অবসরপ্রাপ্ত পরিচালকের নামও আলোচনায় রয়েছে, যিনি নিজেকে একজন মন্ত্রীর আত্মীয় পরিচয় দিয়ে থাকেন বলে বিমানের একাধিক সূত্র জানিয়েছে।

সূত্র জানায়, মিজানুর রশীদের বাবা এবং এক ভাইও বিমানে চাকরি করতেন। মিজানুরের বড় ভাই মো. হারুন অর রশীদ বিমানের বেতন শাখার হিসাব তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন। ভ্রমণ ভাতা ও দৈনিক ভাতার (টিএ/ডিএ) ভুয়া ভাউচার তৈরি করে ছয় কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুর্নীতির মামলায় দোষী সাব্যস্ত হন তিনি। ২০১৮ সালে ঢাকার মহানগর বিশেষ জজ আদালত তাঁকে ১২ লাখ ৭৮ হাজার টাকা জরিমানা ও ৫ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেন। তবে তিনি পলাতক।

মহাব্যবস্থাপক মো. মিজানুর রশীদ অবশ্য দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করছেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, বিভাগীয় মামলা থেকে তাঁকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। দুদকও অব্যাহতি দিয়েছে তাঁকে।

তবে দুদকের উপপরিচালক আকতারুল ইসলামের কাছ থেকে পাওয়া গেল ভিন্ন তথ্য। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, বিমানের মহাব্যবস্থাপক মিজানুর রশীদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান চলছে। কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। আরও কিছু তথ্যের জন্য বিভিন্ন সংস্থায় চিঠিও পাঠানো হয়।

দুদকের সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, গত ১০ ফেব্রুয়ারি দুদক মিজানুর রশীদের বিরুদ্ধে করা অভ্যন্তরীণ তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য ও দুটি সফটওয়্যার কেনার তথ্য, বিভাগীয় মামলার তথ্য চেয়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে একটি চিঠি পাঠানো হয়। গত সপ্তাহে বিমান থেকে এ–সংক্রান্ত তথ্য পেয়েছেন দুদকের অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তারা।

বিষয়টি নিয়ে বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হুমায়রা সুলতানার সঙ্গে কথা বলতে তাঁর নম্বরে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। এই প্রতিবেদক পরিচয় জানিয়ে খুদে বার্তা পাঠালেও তিনি সাড়া দেননি।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের প্রধান কার্যালয় বলাকা ভবন

সফটওয়্যার কেনায় অনিয়ম

বিমানের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ২০১২ সালে বিমানের পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন ছাড়াই ভারতীয় প্রতিষ্ঠান অ্যাসেলিয়া সলিউশন লিমিটেডের কাছ থেকে ‘এফপিএস’ এবং বাজেট সফটওয়্যার কেনা হয়। কেনাকাটায় প্রক্রিয়া যথাযথ হয়নি বলে বিমান তদন্ত কমিটি গঠন করে। সেই অনিয়মে মিজানুর রশীদের সরাসরি সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গিয়েছিল।

সূত্রটি বলছে, ইন্টারলাইন বিলিংয়ের জন্য অ্যাসেলিয়া সলিউশন লিমিটেডের থেকে ‘মিসেলেনিয়াস বিলিং সিস্টেম’ (ফিনেস এমবিএস) সফটওয়্যারটি ২০১২ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর কেনা হয়। এ জন্য বিমানের সঙ্গে কোম্পানিটির পাঁচ বছরের চুক্তি হয়। পরে কিছু অতিরিক্ত সুবিধা যুক্ত করে ২০১৮ সালের ২০ মার্চ সংশোধিত চুক্তি সই হয়।

কাজের ধরন, তথ্য-উপাত্ত (ডেটা), ফলাফল (আউটপুট) ও বিল নির্ধারণের মানদণ্ড (বিলিং ক্রাইটেরিয়া) আলাদা হওয়ার পরও আগের সফটওয়্যারের অতিরিক্ত সুবিধা দেখিয়ে একই প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে সরাসরি (রিপিট অর্ডারের ভিত্তিতে) আরও দুটি সফটওয়্যার কেনা হয়। এর মধ্যে ২০১৬ সালের ২৮ জুন অ্যাডেনডাম-১ হিসেবে ‘ফ্লাইট প্রফিটেবিলিটি সিস্টেম’ (ফিনেস এফপিএস) এবং ২০১৮ সালের ২০ মার্চ ‘ফিনেস কস্ট অ্যান্ড বাজেট’ সফটওয়্যার কেনা হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ফিনেস এমবিএস সফটওয়্যার কেবল ইন্টারলাইন বিলিংয়ের কাজে ব্যবহৃত হয় এবং এটি সম্পূর্ণ ভিন্ন প্ল্যাটফর্ম ও ডেটা সোর্সের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। কিন্তু এগুলোকে একই প্ল্যাটফর্মে দেখিয়ে বাজার যাচাই ছাড়াই প্রোপ্রাইটারি আইটেম ঘোষণা করে আরএফপি প্রকাশ না করেই একক উৎস থেকে প্রফিটেবিলিটি ও বাজেট সফটওয়্যার কেনার সুযোগ করে দেন তৎকালীন মহাব্যবস্থাপক (রাজস্ব) মিজানুর।

সফটওয়্যার কেনার দুর্নীতি নিয়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ২০২২ সালে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। সেই তদন্তে মিজানুর রশীদের দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া যায়। পরে তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়। তবে সে সময়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও সিইও তাঁর ‘অতীত সুনামের’ কথা উল্লেখ করে দায় থেকে অব্যাহতি দেন।

বিমানের তদন্ত কমিটি সূত্র জানায়, আরএফপি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে উদ্যোগের বিষয়টি নিশ্চিত না করে কোনো আইটেমকে প্রোপ্রাইটারি ঘোষণা করা যুক্তিযুক্ত হয়নি। এ ছাড়া প্রশাসনিক আদেশ ব্যবহার করে ‘অতিরিক্ত কাজ’ দেখিয়ে সফটওয়্যার কেনার অভিযোগও রয়েছে। তদন্ত কমিটির মতে, ওই প্রশাসনিক আদেশ মূলত প্রজেক্ট অ্যান্ড ওয়ার্কস বিভাগের পূর্তকাজের জন্য প্রযোজ্য। মূল সফটওয়্যারের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক না থাকা সত্ত্বেও কোনো টেন্ডার ছাড়াই প্রফিটেবিলিটি ও বাজেট সফটওয়্যার কেনা হয়েছে।

বিমানের তদন্ত কমিটির মতামতে বলা হয়েছে, বিভ্রান্তিকর তথ্য উপস্থাপন করে অ্যাসেলিয়া সলিউশন লিমিটেডের কাছ থেকে ‘এফপিএস’ এবং বাজেট সফটওয়্যার কেনার জন্য তৎকালীন প্রধান বাণিজ্যিক কর্মকর্তা (সিএফও) ভিনিত সুদ ও মিজানুর রশীদ সমানভাবে দায়ী। ভারতের নাগরিক ভিনিত সুদ ২০২০ সালে বিমানের চাকরি ছেড়ে যান।

তদন্ত কমিটির পর্যালোচনায় দেখা গেছে, বিমানের ক্রয় নীতিমালা লঙ্ঘন করে এবং পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্ত বা অনুমোদন ছাড়াই এই দুটি সফটওয়্যার কেনা হয়। তৎকালীন মহাব্যবস্থাপক (রাজস্ব) মিজানুর রশীদ বিমানের পক্ষে চুক্তিতে সই করেন। বর্তমানে ফিনেস এফপিএস সফটওয়্যারটি পেনড্রাইভের মাধ্যমে তথ্য আপলোড করার পরই কেবল মুনাফা বিশ্লেষণ (প্রফিটেবিলিটি) প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারে। অথচ আগে একই কাজ নিজস্বভাবে এমএস এক্সেল ব্যবহার করে করা হতো। এই সফটওয়্যার ব্যবহারে এখন পর্যন্ত প্রায় তিন কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে।

তদন্ত কমিটি দেখতে পায়, একইভাবে পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন ছাড়াই ফিনেস কস্ট অ্যান্ড বাজেট সফটওয়্যার কেনা হলেও এটি কোনো কাজে আসেনি। ফলে সফটওয়্যারটি ব্যবহার করা হচ্ছে না। তবু ২০১৮ ও ২০১৯ সালে মোট ২৪ হাজার মার্কিন ডলার (বর্তমান দরে ২৯ লাখ ২৮ হাজার টাকা) পরিশোধ করা হয়।

অভিযোগ রয়েছে, বিমান বাজেট সফটওয়্যার কখনো ব্যবহার না করলেও ২০২৪ সালের ১ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক চিঠিতে তৎকালীন এমডি ও সিইও উল্লেখ করেন যে বাজেট প্রস্তুতের কাজে সফটওয়্যারটি এখনো সফল ও কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

এই সফটওয়্যার কেনার দুর্নীতি নিয়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ২০২২ সালে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। সেই তদন্তে মিজানুর রশীদের দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া যায়। পরে তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়। তবে সে সময়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও সিইও তাঁর ‘অতীত সুনামের’ কথা উল্লেখ করে দায় থেকে অব্যাহতি দেন।

Read at source