দখল, দ্বন্দ্ব ও চাঁদাবাজির জন্য ‘ইচ্ছেমতো’ আসামি
· Prothom Alo
কন্যাশিশুর জন্মের পর স্ত্রীকে নিয়ে ঢাকার সিদ্ধেশ্বরীর মনোয়ারা হাসপাতালে ছিলেন ব্যবসায়ী ইসমাইল হোসেন প্রধানীয়া (৪৮)। সেখান থেকেই গত বছরের ৫ মে তাঁকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। অভিযোগ, ভাটারা থানার মো. রিয়াজ হত্যা মামলায় তিনি জড়িত।
গ্রেপ্তারের পর ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, প্রধানীয়ার বিরুদ্ধে রাজধানীর বিভিন্ন থানায় জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময়কার হত্যা মামলা আছে। সেখানে তাঁর পরিচয় দেওয়া হয় রমনা থানা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে।
Visit sportfeeds.autos for more information.
ঢাকার আদালতে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত বছরের ১৮ জুন রিয়াজ হত্যা মামলায় জামিন পান প্রধানীয়া। সেদিনই ভাটারা থানার আরেকটি মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। নতুন মামলায় তাঁর পরিচয় লেখা হয়, কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। যদিও স্বেচ্ছাসেবক লীগের কেন্দ্রীয় বা থানা—কোনো কমিটিতেই ইসমাইল প্রধানীয়ার নাম নেই।
শহিদুল ইসলাম ভূঁইয়া, শহীদ ফাইয়াজের বাবা যখন সত্যিকারের অপরাধীদের পরিবর্তে নিরীহ মানুষকে মামলায় আসামি বা গ্রেপ্তারের কথা শুনি, খারাপ লাগে। আমরা চাই প্রকৃত অপরাধীরা ছাড়া না পাক এবং নিরীহ কেউ হয়রানির শিকার না হোক।রিয়াজ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে যাত্রাবাড়ীতে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। এ ঘটনায় গত বছর যাত্রাবাড়ী ও ফতুল্লায় দুটি মামলা হয়েছিল। একই ঘটনায় তৃতীয় মামলা হয় ভাটারা থানায়, যে মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে ইসমাইল প্রধানীয়া ১০৯ দিন জেল খাটেন। যদিও একটি ঘটনায় তিনটি মামলা হওয়ার সুযোগ নেই।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, অ্যাপার্টমেন্ট ও বিপণিবিতানের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের জেরে ইসমাইল প্রধানীয়াকে স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতা সাজিয়ে জুলাই হত্যা মামলায় আসামি করা হয়েছে। গত বছরের ২২ আগস্ট জামিনে মুক্তি পান ইসমাইল প্রধানীয়া। তিনি সম্প্রতি প্রথম আলোকে বলেন, ‘মিথ্যা মামলায় পড়ে আমার জীবন, পরিবার তছনছ হওয়ার মতো অবস্থা। এখনো মামলার ঘানি টানতে হচ্ছে।’
প্রথম আলোর অনুসন্ধানে ১০০টি মামলার পর্যালোচনায় দেখা গেছে, মামলাগুলোতে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের নেতা–কর্মী, সাবেক মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যের পাশাপাশি অনেক সাধারণ বা বিভিন্ন শ্রেণি–পেশার মানুষকে ঢালাও বা হয়রানিমূলকভাবে আসামি করা হয়েছে। এমন ব্যক্তিদের আসামি করার পেছনে ব্যক্তিগত, ব্যবসায়িক বা পেশাগত দ্বন্দ্ব, সম্পদ দখল, চাঁদাবাজি, মামলা-বাণিজ্য বা প্রতিহিংসাজনিত কারণও পাওয়া গেছে। কোথাও অর্থ লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে। দুটি মামলায় তিন মৃত ব্যক্তিকে আসামি করার তথ্যও পাওয়া গেছে।
প্রথম আলোর কাছে অন্তত ১৫ জন ভুক্তভোগী বলেছেন, মামলা থেকে নিষ্কৃতি পেতে তাঁদের ঘুষ দিতে হয়েছে। এ রকম একটি ঘটনায় একজন মামলার বাদীকে শাস্তি দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে আদালতে।
৩২ জন বাদী স্বীকার করেছেন, তাঁরা চেনেন না এমন ব্যক্তিদেরও আসামি করেছেন। অনেক বাদী পরে আদালতে হলফনামা দিয়ে বলেছেন, ভুলবশত আসামি করা হয়েছে। অন্তত ৪৭টি মামলায় ছয় শতাধিক আসামির নাম বাদ দিতে আদালতে আবেদন করা হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে ২০ হাজার থেকে ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেনের তথ্য রয়েছে। চট্টগ্রামের একটি মামলায় দুই আসামির জামিনে আপত্তি নেই বলে আদালতে বক্তব্য দেওয়ার পর বাদীকে হাজতেও পাঠানো হয়েছিল। পরে মুচলেকা দিয়ে তিনি মুক্তি পান।
এ ধরনের হয়রানিমূলক ব্যক্তিদের আসামি করার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী, একশ্রেণির অসাধু আইনজীবী, পুলিশ সদস্য এবং মামলাকেন্দ্রিক বিভিন্ন চক্র জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। আবার জামিনের পর অন্য মামলায় (এজাহারে নাম না থাকা সত্ত্বেও) গ্রেপ্তার দেখানো নিয়ে বাণিজ্য রয়েছে। এ ক্ষেত্রেও একশ্রেণির পুলিশ সদস্যের সহায়তা নিয়েছেন মামলাবাজ চক্র বা ব্যক্তিরা। প্রথম আলোর কাছে অন্তত ১৫ জন ভুক্তভোগী বলেছেন, মামলা থেকে নিষ্কৃতি পেতে তাঁদের ঘুষ দিতে হয়েছে। এ রকম একটি ঘটনায় একজন মামলার বাদীকে শাস্তি দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে আদালতে।
নিরপরাধ ব্যক্তিদের আসামি করে হয়রানির ঘটনায় ক্ষুব্ধ শহীদদের স্বজনেরাও। ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজের ছাত্র শহীদ ফারহান ফাইয়াজের বাবা শহিদুল ইসলাম ভূঁইয়া প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিচারের যে গতি দেখছি, তাতে সন্তান হত্যার ন্যায়বিচার পাব কি না, তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘যখন সত্যিকারের অপরাধীদের পরিবর্তে নিরীহ মানুষকে মামলায় আসামি বা গ্রেপ্তারের কথা শুনি, খারাপ লাগে। আমরা চাই প্রকৃত অপরাধীরা ছাড়া না পাক এবং নিরীহ কেউ হয়রানির শিকার না হোক।’
অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য নিয়ে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি কথা হয় পুলিশের তৎকালীন মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলমের সঙ্গে। তিনি প্রথম আলোকে বলেছিলেন, মামলার তদন্তকালে অপরাধে কারও সম্পৃক্ততা না মিললে পুলিশ সুপারদের স্বপ্রণোদিত হয়ে আদালতে অন্তর্বর্তী তদন্ত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজের ছাত্র শহীদ ফারহান ফাইয়াজের বাবা শহিদুল ইসলাম ভূঁইয়া বিচারের যে গতি দেখছি, তাতে সন্তান হত্যার ন্যায়বিচার পাব কি না, তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।মামলার চিত্র
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে এখন পর্যন্ত শহীদের তালিকায় ৮৩২ জনের নাম এসেছে। আরও ১২ জনের নাম যুক্ত হওয়ার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। আহত ব্যক্তির তালিকায় রয়েছে ১৪ হাজার ৩৬৯ জনের নাম (গত ৮ মার্চ পর্যন্ত)।
গত বছরের ৫ আগস্ট গণ–অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে স্বজন হারানো পরিবারগুলো মামলা করা শুরু করে। এর বাইরে আত্মীয় বা ‘সচেতন নাগরিক’ পরিচয়েও অনেকে মামলা করেছেন। এসব মামলায় শত শত মানুষকে আসামি করা হয়েছে। হয়রানিমূলকভাবে যাঁদের আসামি করা হয়েছে, তাঁদের নামের সঙ্গে আওয়ামী লীগ বা দলটির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের বিভিন্ন পদ জুড়ে দেওয়ার ঘটনাও রয়েছে।
যার কারণে বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় একাধিক দফায় বলা হয়েছিল, মামলা হলেই যাচাই ছাড়া আসামি গ্রেপ্তার করা যাবে না। পাশাপাশি গত বছরের ১০ জুলাই ফৌজদারি কার্যবিধি সংশোধন করে তদন্ত চলাকালে অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন দেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হয়, যেখানে নিরপরাধ ব্যক্তিকে অব্যাহতি দেওয়া যায়। কিন্তু নিরীহ ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার ও হয়রানি বন্ধ হয়নি।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, জুলাই-সংশ্লিষ্ট মোট মামলা হয়েছে ১ হাজার ৮৪১টি। এর মধ্যে হত্যা মামলা ৭৯১টি। ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৪৬টি হত্যা মামলায় অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। অন্য মামলাগুলোর মধ্যে ৯৪টিতে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। ৬৩৮টি মামলায় ৪ হাজার ২৮৫ জনের সম্পৃক্ততা না পাওয়ায় অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে।
পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি (অপরাধ ও পরিচালন) খন্দকার রফিকুল ইসলাম ৮ মার্চ প্রথম আলোকে বলেন, জুলাইয়ের ঘটনাকেন্দ্রিক কিছু মামলায় উদ্দেশ্যমূলকভাবে বা ভুলভাবে আসামি করার ঘটনা পাওয়া গেছে। কিছু ক্ষেত্রে ঘটনাস্থল মিথ্যা দেখানো হয়েছে। পর্যালোচনা করে যেগুলোর সত্যতা পাওয়া যাচ্ছে না, সেগুলোতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়ে নতুন মামলাও নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ‘ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত ১০টি তদারকি দল সারা দেশের মামলাগুলো পর্যবেক্ষণ করছে। তদন্ত কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যাচাই ছাড়া কাউকে গ্রেপ্তার করা যাবে না।’
এক ঘটনায় তিন মামলা, নেপথ্যে কী
স্বজনেরা বলছেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট যাত্রাবাড়ীতে পুলিশের গুলিতে রিয়াজের মৃত্যু হয়েছিল। রাস্তায় তাঁর মরদেহ পড়ে ছিল। একটি ছবি দেখে রিয়াজের স্ত্রী ফারজানা বেগম তাঁর স্বামীকে শনাক্ত করেন। তিনি স্বামীকে হত্যার ঘটনায় সে বছরের ১৪ নভেম্বর যাত্রাবাড়ী থানায় মামলা করেন।
অবশ্য রিয়াজের স্ত্রীর মামলার আগেই ২৩ অক্টোবর একই ঘটনায় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানায় আরেকটি মামলা হয়। ওই ঘটনায় পরের বছর, ২০২৫ সালের ২৫ এপ্রিল ঢাকার ভাটারা থানায় আরেকটি মামলা করেন জনৈক জাহিদুল ইসলাম। এতে ২৮১ জনের নাম উল্লেখ করে আরও ৩০০ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়। তাতে ইসমাইল প্রধানীয়াসহ অনেককে হয়রানিমূলক আসামি করা হয়। মামলায় বাদী জাহিদুল ইসলামের যে ঠিকানা দেওয়া হয়েছে, সেখানে গিয়ে এ নামের কাউকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। যে মুঠোফোন নম্বর উল্লেখ করা হয়েছে, সেটাও বন্ধ।
জুলাই শহীদ রিয়াজের স্ত্রী ফারজানা বেগম প্রথম আলোকে বলেন, ভাটারা ও ফতুল্লা থানায় যাঁরা মামলা করেছেন, তাঁদের তিনি চেনেন না। মানুষকে হয়রানি করে, ভয় দেখিয়ে টাকা আদায়ের জন্য এই মামলাগুলো করা হয়েছে।
ভাটারা থানার উপপরিদর্শক মো. আনোয়ার হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, রিয়াজ হত্যা মামলার বাদী জাহিদুলের কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। প্রাথমিক তদন্তে অভিযোগেরও সত্যতা পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, তাঁরা পরে জানতে পেরেছেন, প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) সাবেক গাড়িচালক আবেদ আলীর সঙ্গে একটি মামলাসহ অনেক মামলা আছে তাঁর বিরুদ্ধে।
পুলিশের অপর একটি সূত্র জানিয়েছে, এই জাহিদুলের বিরুদ্ধে প্রতারণাসহ বিভিন্ন থানায় সাতটি মামলা রয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, এ রকম একজন ব্যক্তির করা মামলায় একজন ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তারে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) কেন এত উদ্যোগী হলো। যেখানে বারবার অন্তর্বর্তী সরকার ও পুলিশের উচ্চপর্যায় থেকে বলেছিল, যাচাই–বাছাই ছাড়া কাউকে গ্রেপ্তার না করতে।
ইসমাইল প্রধানীয়া বলেন, কেবল ভাটারা থানা নয়, যাত্রাবাড়ী, পল্টন, কোতোয়ালি ও আশুলিয়া থানায় গণ-অভ্যুত্থানের ঘটনাসংক্রান্ত আরও পাঁচটি মামলায় তাঁকে আসামি করা হয়েছে। এর পেছনে রয়েছেন নাসির উদ্দিন ওরফে দুলাল নামের এক ব্যক্তি। তাঁর সঙ্গে মৌচাকের ফরচুন শপিং মল ও অ্যাপার্টমেন্টকে কেন্দ্র করে পুরোনো দ্বন্দ্ব রয়েছে। প্রধানীয়া এই শপিং মল দোকান মালিক সমিতি এবং অ্যাপার্টমেন্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। এই মালিক সমিতির ১১ সদস্যের বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় অন্তত ২৮টি মামলা দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে নাসির উদ্দিন দুলালের তিনটি মুঠোফোন নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা করেন এই প্রতিবেদক। দুটি নম্বরই বন্ধ পাওয়া যায়। আরেকটি নম্বরে কল করলে ধরেন এক ব্যক্তি। অভিযোগের কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে তিনি ‘রং নম্বর’ বলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। আর ফোন ধরেননি।
এদিকে ভুক্তভোগীদের দাবি, নাসির উদ্দিন এই ক্ষেত্রে যে মামলাবাজ চক্রকে ব্যবহার করেছেন, তাঁর নেতৃত্বে রয়েছেন সাইফুল ইসলাম বাহার নামের এক ব্যক্তি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাইফুল ইসলাম বাহার মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, এগুলো মিথ্যা। নাসির উদ্দিনকে তিনি ব্যক্তিগতভাবে চেনেন। তবে তাঁর কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ততা নেই।
জমি নিয়ে দ্বন্দ্ব, আসামি পাঁচ মালিক
জুলাই শহীদ তালিকায় নাম রয়েছে কাজী আশরাফ আহমেদ রিয়াজের। তাঁকে হত্যার ঘটনায় ঢাকার মোহাম্মদপুর থানায় মামলা হয় গত বছরের ২ জুলাই। মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে আসামি করা হয়েছে আরও ৯৪ জনকে। এঁদের মধ্যে পাঁচটি নাম কৌতূহলোদ্দীপক। এই ব্যক্তিরা কালশী সড়কের পার্শ্ববর্তী জোয়ারসাহারার একটি জমির যৌথ মালিক। তাঁরা হলেন মিরপুর ডিওএইচএসের ফারুক হোসেন, পল্লবীর আশিকুর রহমান, ক্যান্টনমেন্ট এলাকার নুরুল আমিন প্রামাণিক, মনোয়ারুল ইসলাম ও আহসান হাবীব। এঁদের কারোরই রাজনৈতিক পরিচয় নেই।
মামলার বিষয়ে পুলিশের কাছে দেওয়া এক আবেদনে এই পাঁচ ব্যক্তি জানান, তাঁদের জমিটি সড়কসংলগ্ন। পাশের আরেকটি জমির মালিক মাসুদ আলী গং। জমিটিতে বহুতল আবাসন ভবন (কনডোমিনিয়াম) নির্মাণের জন্য মাসুদ আলীরা একটি আবাসন কোম্পানির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হন। তবে কনডোমিনিয়াম নির্মাণের জন্য সড়কসংলগ্ন পাঁচ ব্যক্তির জমিটিও প্রয়োজন। তাঁদের অভিযোগ, মাসুদ আলীরা কয়েক দফা তাঁদের জমি দখলের চেষ্টা করেছেন। তাতে ব্যর্থ হয়ে জুলাই হত্যা মামলায় ফাঁসিয়েছেন।
অবশ্য জমি দখলের চেষ্টার অভিযোগ অস্বীকার করে মাসুদ আলী প্রথম আলোকে বলেন, মামলার বিষয়েও তিনি কিছু জানেন না।
এ বিষয়ে কথা হয় মামলার বাদী নিহত আশরাফের বাবা কাজী বাবুলের সঙ্গে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, আওয়ামী লীগের চার-পাঁচজন ছাড়া বাকি আসামিদের তিনি চেনেন না। উল্লিখিত পাঁচ ব্যক্তির নাম কীভাবে মামলায় এল, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এত কথা তো বলতে পারছি না।’
মামলায় পাঁচ ব্যক্তির জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বরও দেওয়া আছে। এই নম্বর কোথায় পেলেন, জিজ্ঞেস করলে কাজী বাবুল আবারও বলেন, ‘এত কিছু তো বলতে পারছি না, কিছু না কিছু সহযোগিতা তো অবশ্যই আছে।’
জমির মালিকদের একজন ফারুক হোসেন ৯ মার্চ প্রথম আলোকে বলেন, জমির দলিলে থাকা জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর সংগ্রহ করে মামলার এজাহারে বসানো হয়েছে।
পরে জানা গেছে, এই পাঁচজনকে ভাটারা থানায় করা গণ–অভ্যুত্থানের আরেকটি মামলায়ও আসামি করা হয়েছে।
এক মামলায় আসামি ৯ ব্যবসায়ী
দেশের প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যের বাজারে সুপরিচিত প্রতিষ্ঠান আহমেদ ফুড প্রোডাক্টস। এই প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিনহাজ আহমেদ বাংলাদেশ অ্যাগ্রো প্রসেসরস অ্যাসোসিয়েশনের (বাপা) কোষাধ্যক্ষ। গত বছরের ১৬ জুন বাপার ইফতার মাহফিল ও বার্ষিক সাধারণ সভা থেকে তাঁকে হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার করে ডিবি পুলিশ।
মিনহাজের সঙ্গে সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক এবং মেসার্স আহমেদ অ্যান্ড কোম্পানির মালিক মো. ইকতাদুল হককেও গ্রেপ্তার করা হয়। এই দুজনসহ তাঁদের সংগঠনের সদস্য মোট ৯ জন ব্যবসায়ীকে যাত্রাবাড়ী থানার মো. মাহাদী হাসান (পান্থ) হত্যা মামলায় আসামি করা হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, মাহাদী হাসানকে হত্যার ঘটনায় যাত্রাবাড়ী ও কদমতলী থানায় দুটি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ২০২৪ সালের ৬ অক্টোবর যাত্রাবাড়ী থানার মামলাটি করেন নিহত ব্যক্তির চাচা পরিচয় দেওয়া মো. নাদিম। এ মামলাতেই ৯ ব্যবসায়ীকে আসামি করা হয়েছে। পরে একই ঘটনায় ২০২৪ সালের ৮ নভেম্বর কদমতলী থানায় আরেকটি মামলা করেন শহীদ মাহাদী হাসানের বাবা মো. জাহাঙ্গীর হোসেন।
প্রথম মামলার বাদী মো. নাদিম প্রথম আলোর কাছে নিজেকে কৃষক দলের ডেমরা থানা শাখার সদস্য হিসেবে পরিচয় দেন। তাঁর দাবি, এ মামলার বিষয়ে কথা বলতে দলীয়ভাবে নিষেধ আছে।
তবে মাহাদী হাসানের বাবা মো. জাহাঙ্গীর হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘চাচা পরিচয় দেওয়া নাদিমকে কখনো দেখিনি, নামও শুনিনি। অনেকেই অভিযোগ করেছেন তিনি (নাদিম) মামলা দিয়ে বাণিজ্য করছেন।’
মিনহাজের মা এবং আহমেদ ফুডস প্রোডাক্টসের চেয়ারম্যান সুরাইয়া আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ৮৫ দিন পর কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পেলেও মিনহাজের স্বাভাবিক হতে অনেক সময় লাগছে। তিনি বলেন, ‘অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাচনে পরাজিতরা শত্রুতাবশত পুরো প্যানেলকে জুলাই হত্যা মামলায় আসামি করিয়েছে।’
মোহাম্মদপুরের দুটি হাউজিং প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সরোয়ার খালেদের বিরুদ্ধে রাজধানীর মোহাম্মদপুরসহ বিভিন্ন থানায় অন্তত ১৪টি মামলা হয়। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, গণ–অভ্যুত্থানের পর স্থানীয় শীর্ষ সন্ত্রাসী ও তাঁদের সহযোগীরা চাঁদা চেয়েছিল। তিনি দেননি। এরপর তাঁকে একের পর এক মামলায় জড়ানো হয়।
‘মামলাগুলো যথাযথ প্রক্রিয়ায় হয়নি’
গণ-অভ্যুত্থান হয়েছে প্রায় দেড় বছর আগে। মামলা–বাণিজ্যের প্রতিকারে সরকার ও পুলিশ কিছু কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। তারপরও দেখা যাচ্ছে হয়রানি চলছে।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সদস্য মো. নূর খান প্রথম আলোকে বলেন, অপদস্থ ও বাণিজ্য করতে অনেক মানুষকে আসামি করা হয়েছে। একই ব্যক্তিকে একই তারিখের একাধিক জায়গায় সংঘটিত অপরাধে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এতে পরিষ্কার, মামলাগুলো যথাযথ প্রক্রিয়ায় হয়নি।
নূর খানের মতে, সরকারের উচিত জরুরি ভিত্তিতে এসব মামলার পর্যালোচনা করা। কারণ, সারা দেশের হাজার হাজার মানুষ মামলার শিকার। অনেকে এখনো ঘরে থাকতে পারছেন না, কর্মস্থলে যেতে পারছেন না। তাই দ্রুত যাচাই–বাছাই করে নির্দোষ ব্যক্তিদের হয়রানি থেকে মুক্তির ব্যবস্থা করতে হবে।