‘মুসলিম উম্মাহ’: পরিচয় ও বৈশিষ্ট্য

· Prothom Alo

মহান আল্লাহ যুগে যুগে নবী-রাসুলদের পাঠিয়েছেন একটি সুশৃঙ্খল জাতি বা ‘উম্মাহ’ গঠনের লক্ষ্যে। তবে শেষ নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর অনুসারী তথা মুসলিম উম্মাহর জন্য নির্ধারিত হয়েছে কিছু অনন্য বৈশিষ্ট্য ও মর্যাদা, যা অন্য কোনো জাতির ইতিহাসে মেলা ভার।

Visit somethingsdifferent.biz for more information.

এই উম্মাহর পরিচয়, নবীর বৈশিষ্ট্য এবং ইহকাল ও পরকালে তাদের শ্রেষ্ঠত্বের দিকগুলো পর্যালোচনার দাবি রাখে।

উম্মাহর দ্বৈত পরিচয়

ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায় ‘উম্মাহ’ শব্দটি দুটি ভিন্ন প্রেক্ষাপটে ব্যবহৃত হয়।

প্রথমত, ‘উম্মতে দাওয়াত’। নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর নবুয়ত পরবর্তী সময়ে কিয়ামত পর্যন্ত পৃথিবীতে আসা সকল মানুষ ও জিন এই বলয়ের অন্তর্ভুক্ত। যেহেতু তিনি বিশ্বনবী, তাই সবার কাছেই তাঁর দাওয়াত পৌঁছানো আবশ্যক। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘বলুন, হে মানুষ, আমি তোমাদের সবার প্রতি আল্লাহর রাসুল।’ (সুরা আরাফ, আয়াত: ১৫৮)

নবীজি নিজেও হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ‘সেই সত্তার শপথ যার হাতে মুহাম্মদের প্রাণ, এই উম্মতের যে কেউ আমার কথা শুনল অথচ আমি যা নিয়ে প্রেরিত হয়েছি তার ওপর ঈমান না এনেই মারা গেল, সে অবশ্যই জাহান্নামিদের অন্তর্ভুক্ত হবে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৫৩)।

দ্বিতীয়ত, ‘উম্মতে ইজাবত’। যারা নবীজির আহ্বান গ্রহণ করে ইসলাম কবুল করেছেন, মূলত তারাই আমাদের পরিচিত ‘মুসলিম উম্মাহ’।

এই বিশেষ গোষ্ঠীটিকে মহান আল্লাহ অল্প শ্রমে অধিক সওয়াব এবং জুমার নামাজ, নামাজের কাতার ফেরেশতাদের মতো হওয়াসহ এমন কিছু বিশেষত্ব দিয়েছেন, যা আগের জাতিগুলোর জন্য ছিল না।

উম্মাহর গৌরবের উৎস

উম্মতের মর্যাদা মূলত তাদের নবীর শ্রেষ্ঠত্বেরই ছায়া। প্রখ্যাত আলেম জালালুদ্দিন সুয়ুতি তাঁর আল-খাসাইসুল কুবরা গ্রন্থে নবীজির শতাধিক বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করেছেন।

এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—তাঁর রিসালাত বা বার্তা বিশ্বজনীন হওয়া, পূর্ববর্তী কঠিন কিছু বিধান সহজ হওয়া এবং যুদ্ধলব্ধ সম্পদ (গনিমত) হালাল হওয়া। (সুয়ুতি, আল-খাসাইসুল কুবরা, ১/৩-৫, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ২০০৫)।

এছাড়া নবীজি (সা.)-এর মাধ্যমেই নবুয়তের ধারা সমাপ্ত হয়েছে, যা এই উম্মাহর জন্য বড় এক প্রাপ্তি।

শ্রেষ্ঠ নবীর উম্মত হিসেবে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করতে হবে

ইহলৌকিক জীবনে উম্মাহর বিশেষত্ব

মুসলিম উম্মাহর যাপিত জীবনের প্রধান সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে কিছু মৌলিক বৈশিষ্ট্যের মধ্যে:

১. মধ্যপন্থা ও ভারসাম্য

মুসলিম উম্মাহর সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হলো তাদের ভারসাম্যপূর্ণ জীবনবোধ। তারা আকিদাহ বা বিশ্বাসের ক্ষেত্রে যেমন চরমপন্থী নয়, তেমনি ইবাদতের ক্ষেত্রেও শিথিল নয়। 

নবীজি (সা.) আমাদের সতর্ক করে বলেছেন, ‘তোমরা ধর্মে চরমপন্থা থেকে বেঁচে থাকো। কারণ তোমাদের পূর্ববর্তীরা এই চরমপন্থার কারণেই ধ্বংস হয়ে গেছে।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৩০২৯)

ইবাদতের ক্ষেত্রেও ইসলাম বৈরাগ্যবাদ সমর্থন করে না। সংসার ত্যাগ করে বনে যাওয়া ইসলামের আদর্শ নয়।

নবীজি (সা.) তাঁর সেই সাহাবিদের সংশোধন করে দিয়েছিলেন যারা সারারাত নামাজ পড়া বা বিয়ে না করার সংকল্প করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘আমি আল্লাহকে তোমাদের চেয়ে বেশি ভয় করি, তবুও আমি রোজা রাখি ও ভাঙি, নামাজ পড়ি ও বিশ্রাম নিই এবং বিয়ে করি। যে আমার সুন্নাহর বিমুখ হবে সে আমার দলভুক্ত নয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫০৬৩)

২. সামাজিক দায়বদ্ধতা ও শ্রেষ্ঠত্ব

কোরআনে এই উম্মতকে ‘খায়রু উম্মাহ’ বা শ্রেষ্ঠ জাতি বলা হয়েছে। তবে এই শিরোপা কোনো জাতিগত শ্রেষ্ঠত্বের কারণে নয়, বরং তাদের কর্মের কারণে।

আল্লাহ বলেন, ‘তোমরাই শ্রেষ্ঠ উম্মত, মানবজাতির কল্যাণের জন্য তোমাদের আবির্ভূত করা হয়েছে; তোমরা সৎ কাজের আদেশ দেবে এবং অসৎ কাজে বাধা দেবে...।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১১০)

অর্থাৎ সমাজ সংস্কারের এই নৈতিক দায়বদ্ধতা পালন করলেই কেবল এই শ্রেষ্ঠত্ব সার্থক হয়।

৩. ধর্মের সহজতা ও স্থায়িত্ব

ইসলাম কোনো জবরদস্তিমূলক ধর্ম নয়। এর বিধানগুলো মানুষের সাধ্যাতীত কোনো বোঝা চাপিয়ে দেয় না। (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৮৬)

পানি না থাকলে তায়াম্মুমের বিধান বা মুসাফিরের জন্য নামাজের কসর—এই সবই আল্লাহর বিশেষ করুণা। এছাড়া মহান আল্লাহ স্বয়ং কোরআন ও সুন্নাহর সংরক্ষণের দায়িত্ব নিয়েছেন। ফলে এই দ্বীন কিয়ামত পর্যন্ত অবিকৃত থাকবে। 

নবীজি (সা.)-এর সুসংবাদ অনুযায়ী, কেয়ামত পর্যন্ত এই উম্মতের একটি দল সত্যে অটল থাকবে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৯২০)

নবীজি (সা.)–এর উম্মত হিসেবে আমাদের করণীয়

পরকালীন জীবনের বিশেষ মর্যাদা

কেয়ামতের বিভীষিকাময় দিনেও এই উম্মত কিছু বিশেষ নিদর্শনের মাধ্যমে আলাদা হয়ে থাকবে:

• অজুর জ্যোতি: হাশরের ময়দানে অজুর প্রভাবে এই উম্মতের হাত-পা ও মুখমণ্ডল নূরের আভায় উজ্জ্বল থাকবে। নবীজি (সা.) এই চিহ্ন দেখেই তাঁর প্রিয় উম্মতদের চিনে নেবেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৩৬)

• নবীদের পক্ষে সাক্ষ্যদান: হজরত নুহ (আ.)-সহ আগের নবীরা যখন দাবি করবেন যে তারা দাওয়াত পৌঁছে দিয়েছেন এবং তাঁদের উম্মতরা তা অস্বীকার করবে, তখন মুসলিম উম্মাহ নবীদের পক্ষে সাক্ষ্য দেবে। (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৪৩; সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪৪৮৭)

• প্রথম জান্নাতি: দুনিয়ার ইতিহাসে শেষে আসলেও জান্নাতে প্রবেশের ক্ষেত্রে এই উম্মত হবে সবার আগে। নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘আমরা দুনিয়ার হিসেবে শেষে আসলেও কেয়ামত দিবসে হব অগ্রগামী এবং আমরাই প্রথম জান্নাতে প্রবেশ করব।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৮৫৫)

• হিসাবহীন জান্নাতি: এই উম্মতের একটি বিশাল অংশ কোনো হিসাব ও শাস্তি ছাড়াই জান্নাতে যাওয়ার গৌরব অর্জন করবে।

এক বর্ণনায় এসেছে, প্রতি হাজারের সঙ্গে আরও সত্তর হাজার করে মানুষ এই সুযোগ পাবে। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৪৩৭)

মুসলিম উম্মাহর এই উচ্চ মর্যাদা কেবল উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত কোনো সম্পদ নয়। এর মূল ভিত্তি হলো ইমান ও আমলের মেলবন্ধন। যখনই এই উম্মত মধ্যপন্থা ও ত্যাগের পথ থেকে বিচ্যুত হবে, তখনই তারা তাদের হারানো গৌরব ফিরে পাওয়ার যোগ্যতা হারাবে।

বেহেশতে ঘর নির্মাণ হবে যাদের জন্য

Read at source