রেনে দেকার্তের জাদুকরী দুনিয়া

· Prothom Alo

কনকনে শীতের রাত। বাইরে প্রবল তুষারপাত হচ্ছে। ১৬১৯ সালের শীতকালটা ইউরোপে একটু বেশিই শীতল ছিল। জার্মানির নিউবার্গ শহরের ছোট্ট এক উষ্ণ কামরায় একা বসে আছেন এক তরুণ সৈনিক। কিন্তু বাইরের এই শান্ত পরিবেশের সঙ্গে তাঁর ভেতরের অবস্থার কোনো মিল নেই। তাঁর মাথার ভেতর তখন চলছে এক বিশাল প্রলয়ংকরী ঝড়! না, কোনো সাধারণ ঝড় নয়, সন্দেহের ঝড়।

Visit umafrika.club for more information.

তিনি ভাবছেন, আমি চোখে যা দেখছি, তা কি সত্যি? এই যে আকাশ, মাটি, গাছপালা; এসবের অস্তিত্ব কি সত্যিই আছে? নাকি আমি চোখ বন্ধ করে কোনো দীর্ঘ স্বপ্ন দেখছি? আচ্ছা, আমাকে ছোটবেলা থেকে স্কুলের শিক্ষকেরা যা যা পড়িয়েছেন, বড় বড় পণ্ডিতদের বইয়ে যা লেখা আছে, তার সবই যদি ভুল হয়?

তরুণটি এক অদ্ভুত সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি ভাবলেন, আজ থেকে তিনি সব কিছুকেই মিথ্যা বলে ধরে নেবেন। নিজের শরীর, হাত-পা, চারপাশের জগৎসহ সবকিছু! কিন্তু এসব বাতিল করতে করতে হঠাৎ তিনি এমন একটা জায়গায় এসে থমকে দাঁড়ালেন, যেটাকে পৃথিবীর কোনো জাদুকরও আর মিথ্যা প্রমাণ করতে পারবে না।

ল্যাপলাসের দৈত্য: বিজ্ঞান ও দর্শনের সবচেয়ে রহস্যময় ভূত
জার্মানির নিউবার্গ শহরের ছোট্ট এক উষ্ণ কামরায় একা বসে আছেন এক তরুণ সৈনিক রেনে দেকার্তে। কিন্তু বাইরের এই শান্ত পরিবেশের সঙ্গে তাঁর ভেতরের অবস্থার কোনো মিল নেই।

তিনি অবাক হয়ে ভাবলেন, আমি আমার চারপাশের সবকিছু নিয়ে সন্দেহ করছি ঠিকই, কিন্তু এই যে আমি সন্দেহ করছি বা চিন্তা করছি; এটা তো আর মিথ্যা নয়! আর চিন্তা করার জন্য তো অন্তত একজন আমি’কে থাকতে হবে। আমি না থাকলে তো এই চিন্তাও থাকবে না!

ওই কনকনে শীতের রাতে, একাকী সেই ছোট্ট কামরায় বসে তরুণটি আবিষ্কার করে ফেললেন পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত এবং শক্তিশালী একটি বাক্য—‘আমি চিন্তা করি, তাই আমি আছি!’

শুধু এই একটি বাক্য দিয়ে তিনি ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছিলেন হাজার বছরের পুরোনো সব ভুল ধারণা। জন্ম দিয়েছিলেন আধুনিক দর্শনের। শুধু দর্শনই নয়, একটি মাছির ওড়াউড়ি দেখে জ্যামিতির ছক থেকে শুরু করে বীজগণিতের সমীকরণ মিলিয়ে দিয়েছিলেন এক জাদুকরী সুতোয়। তিনি আধুনিক দর্শন ও অ্যানালিটিক জ্যামিতির জনক রেনে দেকার্ত!

হাইপেশিয়া: প্রথম নারী গণিতবিদ
দেকার্ত শারীরিকভাবে বেশ দুর্বল ছিলেন, প্রায়ই অসুস্থ থাকতেন। তাঁর বয়স যখন দশ বছর, তখন তাঁকে পাঠানো হলো লা ফ্লেশ নামে একটি নামকরা জেসুইট বোর্ডিং স্কুলে।

দুই

১৫৯৬ সালের ৩১ মার্চ ফ্রান্সের লা হে আন তোরেইন নামে একটি ছোট্ট গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন রেনে দেকার্ত। পরে তাঁর সম্মানার্থে ১৯৬৭ সালে গ্রামটির নাম রাখা হয় দেকার্ত। তাঁর বাবা জোয়াকিম ছিলেন আদালতের বিচারক ও কাউন্সিলর। দেকার্তের বয়স যখন মাত্র এক বছর, তখন তাঁর মা জ্যান সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মারা যান। মাতৃহীন ছোট্ট দেকার্তকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় তাঁর দাদির কাছে।

দেকার্ত শারীরিকভাবে বেশ দুর্বল ছিলেন, প্রায়ই অসুস্থ থাকতেন। তাঁর বয়স যখন দশ বছর, তখন তাঁকে পাঠানো হলো লা ফ্লেশ নামে একটি নামকরা জেসুইট বোর্ডিং স্কুলে। ১৬০৪ সালে ফরাসি রাজা চতুর্থ হেনরি এই স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। দেকার্তের দুর্বল স্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে স্কুল কর্তৃপক্ষ তাঁকে একটা দারুণ সুযোগ দিল। অন্য সব ছেলেকে যেখানে কনকনে শীতে ভোর ৫টায় উঠতে হতো, দেকার্তকে সেখানে বেলা ১১টা পর্যন্ত বিছানায় শুয়ে থাকার অনুমতি দেওয়া হলো!

দেকার্ত শারীরিকভাবে বেশ দুর্বল ছিলেন, প্রায়ই অসুস্থ থাকতেন

তরুণ দেকার্ত এই সুযোগের দারুণ সদ্ব্যবহার করলেন। তিনি ঘুম থেকে জেগে ওঠার পরও ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিছানায় শুয়ে থাকতেন। একা মনে তিনি চুপচাপ বসে ভাবতেন। স্কুলে তাঁকে যা যা শেখানো হতো, সবকিছু নিয়ে তিনি মনে মনে তর্ক করতেন।

গণিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের অবিসংবাদিত প্রতিভা ল্যাপলাস
দেকার্তের বয়স যখন মাত্র এক বছর, তখন তাঁর মা জ্যান সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মারা যান। মাতৃহীন ছোট্ট দেকার্তকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় তাঁর দাদির কাছে।

কিন্তু স্কুলজীবনের এই পড়াশোনা তাঁকে মোটেও সন্তুষ্ট করতে পারল না। তিনি পরে তাঁর এই হতাশার কথা লিখেছিলেন ঠিক এভাবে:

‘আমাকে বলা হয়েছিল, এই পড়াশোনা দিয়ে আমি জীবনের সব প্রয়োজনীয় এবং নিশ্চিত জ্ঞান অর্জন করতে পারব। আমারও শেখার দারুণ আগ্রহ ছিল। কিন্তু পড়াশোনা শেষ করে আমি যখন তথাকথিত জ্ঞানী মানুষের কাতারে পৌঁছালাম, তখন আমার ধারণা পুরোপুরি পালটে গেল। দেখলাম আমার চারপাশের জ্ঞান এত এত ভুল ও সন্দেহে ভরা যে, এই পড়াশোনা থেকে আমি শুধু একটাই জিনিস শিখতে পেরেছি—আমি আসলে কতটা মূর্খ!’

পুরো স্কুলে দেকার্তের কাছে শুধু একটি বিষয়ই ভালো লাগত—গণিত। কারণ গণিতে কোনো সন্দেহ নেই। ২ ও ২ যোগ করলে সব সময়ই ৪ হয়, এখানে কারও কোনো মতামত বা তর্কের জায়গা নেই। তিনি লিখেছেন:

‘আমি সবচেয়ে বেশি আনন্দ পেতাম গণিতে। কারণ এর যুক্তিগুলো একদম নিশ্চিত এবং নিখুঁত। কিন্তু তখনো আমি এর আসল ব্যবহার জানতাম না। আমার অবাক লাগত এটা ভেবে যে, গণিতের ভিত্তি এত শক্ত হওয়া সত্ত্বেও মানুষ কেন এর ওপর ভিত্তি করে আরও মহান কিছু তৈরি করেনি!’

গণিতের রাজপুত্র কার্ল ফ্রেডরিখ গাউস এবং তাঁর রাজকীয় সংখ্যার জগৎ
পুরো স্কুলে দেকার্তের কাছে শুধু একটি বিষয়ই ভালো লাগত—গণিত। কারণ গণিতে কোনো সন্দেহ নেই। ২ ও ২ যোগ করলে সব সময়ই ৪ হয়, এখানে কারও কোনো মতামত বা তর্কের জায়গা নেই।

তিন

পড়াশোনা শেষে দেকার্ত তাঁর বাবা এবং বিচারক মামা রেনে ব্রোচার্ডের পথ ধরে আইন নিয়ে পড়তে পয়েটিয়ার্স বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ১৬১৬ সালে তিনি আইনের ডিগ্রি লাভ করেন।

এখানে একটি দারুণ মজার ইতিহাস লুকিয়ে আছে! দেকার্তের পিএইচডি থিসিসে কী লেখা ছিল, তা মানুষের অজানা ছিল প্রায় কয়েক শতাব্দী। ১৯৮১ সালে একটি রেস্তোরাঁর দেয়ালে ঝোলানো ১৭ শতকের একটি পুরোনো খোদাই করা ছবির ফ্রেম বদলাতে গিয়ে এক জাদুঘরের কিউরেটর আবিষ্কার করেন, ফ্রেমের ঠিক পেছনে লুকিয়ে আছে ১৬১৬ সালে ছাপা হওয়া একটি কাগজ। সেখানে দেকার্তের থিসিস ডিফেন্সের ঘোষণা লেখা ছিল! সেখানে তিনি তাঁর মামা রেনে ব্রোচার্ডকে সম্মান জানিয়ে ৪০টি যুক্তির কথা উল্লেখ করেছিলেন।

যাহোক, আইন পাস করলেও দেকার্তের মন টিকল না। কারণ আইনের বই মানুষের তৈরি, এর সঙ্গে প্রকৃতির সত্যের কোনো সম্পর্ক নেই। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, আর কোনো বই পড়বেন না। তিনি লিখেছেন:

‘আমি বইয়ের পড়াশোনা পুরোপুরি ছেড়ে দিলাম। সিদ্ধান্ত নিলাম, আমি শুধু সেই জ্ঞানই খুঁজব, যা আমি নিজের ভেতর থেকে অথবা এই প্রকৃতির বিশাল বই থেকে খুঁজে পাব।’

১৬১৮ সালে তিনি নেদারল্যান্ডসের ব্রেডায় একটি মিলিটারি স্কুলে যোগ দেন। তিনি প্রিন্স মরিস অব নাসাউ এবং বাভারিয়ার ডিউক ম্যাক্সিমিলিয়ানের সেনাবাহিনীতে কাজ করেন। ১৬২০ থেকে ১৬২৮ সাল পর্যন্ত চষে বেড়ান পুরো ইউরোপ। এ সময় প্যারিসে তাঁর পরিচয় হয় ফরাসি যাজক ও গণিতবিদ মারিন মেরসেনের সঙ্গে। মারিনই তাঁকে তাঁর বৈজ্ঞানিক ভাবনাগুলো লিখে রাখতে উৎসাহ দিয়েছিলেন।

০.৯৯৯...এবং ১ কি সমান
দেকার্তে লিখেছেন, ‘আমি বইয়ের পড়াশোনা পুরোপুরি ছেড়ে দিলাম। সিদ্ধান্ত নিলাম, আমি শুধু সেই জ্ঞানই খুঁজব, যা আমি নিজের ভেতর থেকে অথবা এই প্রকৃতির বিশাল বই থেকে খুঁজে পাব।’

চার

প্যারিস তখন বিশ্বের জ্ঞানবিজ্ঞানের অন্যতম কেন্দ্র। কিন্তু কোলাহল দেকার্তের পছন্দ নয়। তাই ১৬২৮ সালে তিনি প্যারিস ছেড়ে নেদারল্যান্ডসের এক নিভৃত ঠিকানায় চলে যান। সেখানে গিয়ে এমন এক দর্শন তৈরির কাজে হাত দেন, যা গণিতের মতো নিখুঁত হবে।

১৬৩৩ সালে তিনি পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে তাঁর প্রথম বড় বই দ্য ওয়ার্ল্ড লেখা শেষ করেন। কিন্তু ঠিক ওই সময়েই খবর আসে, বিখ্যাত বিজ্ঞানী গ্যালিলিওকে ক্যাথলিক চার্চ গৃহবন্দী করেছে। গ্যালিলিওর অপরাধ ছিল, তিনি বলেছিলেন পৃথিবী নয় সূর্যই সৌরজগতের কেন্দ্রে। দেকার্তও তাঁর বইয়ে একই কথা লিখেছিলেন। চার্চের রোষানলে পড়ার ভয়ে তিনি বইটি প্রকাশ করা থেকে পিছিয়ে আসেন।

রেনে দেকার্তের লেখা বই ডিসকোর্স অন দ্য মেথড

১৬৩৭ সালে তিনি তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত বই ডিসকোর্স অন দ্য মেথড প্রকাশ করেন। মজার ব্যাপার হলো, সে যুগে সব বড় বিজ্ঞান বা দর্শনের বই ল্যাটিন ভাষায় লেখা হতো, যাতে শুধু পণ্ডিতরাই তা পড়তে পারেন। কিন্তু দেকার্ত তাঁর বইটি লিখলেন সাধারণ মানুষের মুখের ভাষা ফরাসিতে, যাতে যে কেউ পড়ে তা বুঝতে পারেন।

চতুর্থ মাত্রায় কি গিট দেওয়া সম্ভব
১৬৩৩ সালে রেনে দেকার্তে পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে তাঁর প্রথম বড় বই দ্য ওয়ার্ল্ড লেখা শেষ করেন। কিন্তু ঠিক ওই সময়েই খবর আসে, বিখ্যাত বিজ্ঞানী গ্যালিলিওকে ক্যাথলিক চার্চ গৃহবন্দী করেছে।

এই বইয়ে তিনি তাঁর বিখ্যাত চারটি নিয়মের কথা বলেন। নিয়মগুলো হলো:

১. যা কিছু স্বতঃসিদ্ধ নয় বা একেবারে নিশ্চিত নয়, তাকে সত্য বলে মেনে না নেওয়া।

২. যেকোনো বড় বা জটিল সমস্যাকে ছোট ছোট সহজ অংশে ভাগ করে নেওয়া।

৩. সবচেয়ে সহজ সমস্যাটি আগে সমাধান করে ধীরে ধীরে কঠিনের দিকে যাওয়া।

৪. পুরো প্রক্রিয়াটি বারবার চেক করা, যাতে কোনো ভুল না থাকে।

এই নিখুঁত যুক্তির খোঁজ করতে গিয়েই দেকার্ত তাঁর জীবনের সবচেয়ে বিখ্যাত কথাটি বলেন। তিনি ভাবলেন, ‘আমি আমার চারপাশের সবকিছু নিয়ে সন্দেহ করতে পারি। কিন্তু আমি যে সন্দেহ করছি বা চিন্তা করছি, সেটা তো আর অস্বীকার করতে পারি না! আমি যেহেতু চিন্তা করছি, তার মানে আমি আস্তিত্বশীল।’

ল্যাটিন ভাষায় তিনি এর নাম দিলেন কগিটো এরগো সাম। এর অর্থ হলো, ‘আমি চিন্তা করি, তাই আমি আছি।’

রেনে দেকার্তের লেখা প্রিন্সিপিয়া ফিলোসোফিয়া বইয়ের প্রথম পৃষ্ঠা

দেকার্ত বিশ্বাস করতেন, দর্শন ও বিজ্ঞানকে গণিতের মতো শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে হবে। জ্যামিতিতে যেমন কিছু স্বতঃসিদ্ধ থাকে, দর্শনেও তেমন কিছু থাকা চাই। স্বতঃসিদ্ধ মানে যাকে আর প্রমাণ করার দরকার হয় না।

যেমন আধুনিক সংখ্যাতত্ত্বের কথাই ধরা যাক। ইতালীয় গণিতবিদ জিউসেপ্পে পিয়ানোর নামানুসারে তৈরি পিয়ানো অ্যাক্সিয়ম হলো পাঁচটি সাধারণ নিয়মের সমষ্টি, যার ওপর ভিত্তি করে পুরো সংখ্যার জগৎ দাঁড়িয়ে আছে। দেকার্তের ‘আমি চিন্তা করি, তাই আমি আছি’ কথাটিও আধুনিক পশ্চিমা দর্শনের জন্য ঠিক এমনই একটি নীতি হিসেবে কাজ করে। ১৬৪৪ সালে প্রকাশিত তাঁর প্রিন্সিপিয়া ফিলোসোফিয়া (নিউটনের ফিলোসোফিয়া ন্যাচারালিস প্রিন্সিপিয়া ম্যাথমেটিকা নয়) বইয়ে তিনি এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।

জুতার ফিতা বাঁধার জ্যামিতি!
দেকার্ত বিশ্বাস করতেন, দর্শন ও বিজ্ঞানকে গণিতের মতো শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে হবে। জ্যামিতিতে যেমন কিছু স্বতঃসিদ্ধ থাকে, দর্শনেও তেমন কিছু থাকা চাই।

পাঁচ

দর্শনের পাশাপাশি দেকার্ত গণিতে যা করে গেছেন, তা শুনলে হয়তো আপনি রীতিমতো চমকে যাবেন! আগে জ্যামিতি এবং বীজগণিত ছিল সম্পূর্ণ আলাদা দুটি বিষয়। দেকার্ত ভাবলেন, এদের কি মেলানো যায় না?

একটি মজার গল্প প্রচলিত আছে। একদিন দেকার্ত তাঁর স্বভাবমতো সকালে বিছানায় শুয়ে ছিলেন। হঠাৎ তিনি দেখলেন, ছাদের ওপর একটি মাছি বসে আছে। তিনি চিন্তা করলেন, ‘আমি যদি কাউকে বোঝাতে চাই মাছিটা ছাদের ঠিক কোথায় বসে আছে, তবে কীভাবে বোঝাব?’ তিনি ভাবলেন, ছাদের এক কোণ থেকে লম্বালম্বি এবং আড়াআড়ি দুটি কাল্পনিক রেখা টানলে খুব সহজেই বলা যাবে, মাছিটা ওই রেখাগুলো থেকে কত দূরে আছে!

এখান থেকেই জন্ম নিল কার্তেসীয় স্থানাঙ্ক ব্যবস্থা। দেকার্তের ল্যাটিন নাম কার্টেসিয়াস থেকেই এই কার্তেসীয় নামের উৎপত্তি। এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের ফলে মানুষ প্রথম জানল, জ্যামিতির যেকোনো রেখা বা বৃত্তকে বীজগণিতের সমীকরণ দিয়ে প্রকাশ করা সম্ভব!

যেমন, আপনি যদি একটি সরলরেখা আঁকতে চান, তবে তার সমীকরণ হতে পারে: y = 2x + 1। আবার মূলবিন্দুকে কেন্দ্র করে একটি বৃত্ত আঁকতে চাইলে তার সমীকরণ হবে: x2 + y2 = r2। এটাই অ্যানালিটিক জ্যামিতি। এই আবিষ্কারটি না হলে পরবর্তীকালে আইজ্যাক নিউটন বা গটফ্রিড লিবনিজ কখনোই ক্যালকুলাস আবিষ্কার করতে পারতেন না!

টাকা দ্বিগুণ করার জাদুকরী সংখ্যা
কার্তেসীয় স্থানাঙ্ক ব্যবস্থা আবিষ্কারের ফলে মানুষ প্রথম জানল, জ্যামিতির যেকোনো রেখা বা বৃত্তকে বীজগণিতের সমীকরণ দিয়ে প্রকাশ করা সম্ভব!

শুধু তা-ই নয়, আমরা যে অঙ্কের অজানা রাশি বোঝাতে x, y, z বা জানা রাশি বোঝাতে a, b, c ব্যবহার করি, এটাও দেকার্তেরই নিয়ম! আবার কোনো সংখ্যার পাওয়ার বা সূচক বোঝাতে সংখ্যার মাথার ওপর ছোট করে লেখার (যেমন: x2 বা x3) নিয়মটিও তিনিই প্রথম শুরু করেন।

তাঁর আরেকটি দারুণ আবিষ্কার হলো দেকার্তের উপপাদ্য। ধরুন, তিনটি বৃত্ত r1,r2,r3 একে অপরকে স্পর্শ করে আছে। আপনি যদি এই তিনটি বৃত্তকে স্পর্শ করে এমন আরেকটি চতুর্থ বৃত্ত আঁকতে চান, তবে সেই চতুর্থ বৃত্তের ব্যাসার্ধ (r4​) বের করার একটি জাদুকরী সমীকরণ তিনি দিয়েছিলেন:

এখানে ± চিহ্ন থাকার মানে, আপনি চাইলে ওই তিনটি বৃত্তের ভেতরে একটি ছোট বৃত্ত আঁকতে পারেন, আবার বাইরে দিয়ে একটি বড় বৃত্তও আঁকতে পারেন!

তরমুজ বিক্রির ২৫০ টাকা গেল কোথায়
৫৩ বছর বয়সী দেকার্ত রানির নির্দেশ অমান্য করতে পারলেন না। প্রতিদিন ভোরে হাঁড়কাঁপানো ঠান্ডার মধ্যে হেঁটে রানির প্রাসাদে যেতে হতো তাঁকে।

ছয়

দেকার্ত কখনোই জনসমক্ষে আসতে চাইতেন না। তিনি নেদারল্যান্ডসের কোথায় থাকতেন, তা কেউ জানত না। শুধু তাঁর বন্ধু মারিন মেরসেন জানতেন তাঁর ঠিকানা। চিঠির মাধ্যমেই তিনি অন্যান্য বিজ্ঞানীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন।

১৬৪৯ সাল। তত দিনে দেকার্ত পুরো ইউরোপের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী ও দার্শনিক হিসেবে খ্যাতি পেয়ে গেছেন। সুইডেনের রানি ক্রিস্টিনা দেকার্তকে আমন্ত্রণ জানালেন তাঁর রাজদরবারে। রানি চাইলেন, দেকার্ত তাঁকে দর্শন শেখাবেন এবং একটি বিজ্ঞান একাডেমি গড়তে সাহায্য করবেন।

প্রথমে রাজি না হলেও অনেক অনুরোধের পর দেকার্ত সুইডেনে যেতে বাধ্য হন। কিন্তু সমস্যা বাঁধল অন্য জায়গায়। জীবনভর যে মানুষটি বেলা ১১টা পর্যন্ত ঘুমিয়ে অভ্যস্ত, ২২ বছর বয়সী রানি ক্রিস্টিনা জেদ ধরলেন, তাঁর দর্শনের ক্লাস করতে হবে কনকনে শীতের ভোরে, ঠিক ভোর ৫টায়!

৫৩ বছর বয়সী দেকার্ত রানির নির্দেশ অমান্য করতে পারলেন না। প্রতিদিন ভোরে হাঁড়কাঁপানো ঠান্ডার মধ্যে হেঁটে রানির প্রাসাদে যেতে হতো তাঁকে। সারাজীবনের তৈরি হওয়া শরীরের সেই সার্কাডিয়ান রিদম বা জৈবিক ঘড়ি পুরোপুরি ভেঙে পড়ল। তাঁর শরীর দুর্বল হয়ে গেল। দ্রুতই তিনি আক্রান্ত হলেন নিউমোনিয়ায়।

অসুস্থ হওয়ার মাত্র ১০ দিন পর, ১৬৫০ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি, সুইডেনের স্টকহোমে এই মহান বিজ্ঞানীর জীবনাবসান ঘটে।

যে ভোরের ঘুম তাঁকে দিয়েছিল পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ এক দার্শনিকের চিন্তাশক্তি, সেই ভোরের ঘুম ভাঙার কারণেই তাঁর মৃত্যু হলো। কিন্তু রেনে দেকার্ত মরে গিয়েও অমর হয়ে আছেন আমাদের জ্যামিতির বইয়ের পাতায়, বীজগণিতের মধ্যে। আর বেঁচে আছেন মানুষের চিন্তার সেই অমোঘ বাক্যে—‘আমি চিন্তা করি, তাই আমি আছি।’

সূত্র: ম্যাথ মেকারস: দ্য লাইভস অ্যান্ড ওয়ার্কস অব ফিফটি ফেমাস ম্যাথেমেটিশিয়ান অবলম্বনেগড়ের গোলকধাঁধা: লটারি, কয়েন ও মহাকাশে হারিয়ে যাওয়া

Read at source