বাংলাদেশের যাতায়াত ব্যবস্থায় একযুগে এইচএনবিএল
· Prothom Alo
বাংলাদেশের পিচঢালা রাজপথ থেকে শুরু করে গ্রামের মেঠো পথ—সবখানেই একটি ব্র্যান্ডের সরব উপস্থিতি চোখে পড়ে। সেটি হলো ‘হিরো’। দুই দশকের বেশি সময় ধরে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় টু-হুইলার নির্মাতা হিসেবে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখা এই কোম্পানি বাংলাদেশে কেবল ব্যবসা নয়, বরং তৈরি করেছে এক বিশাল আস্থার ইকোসিস্টেম। নিটল নিলয় গ্রুপের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে ‘এইচএমসিএল নিলয় বাংলাদেশ লিমিটেড’ (এইচএনবিএল) গঠনের মাধ্যমে দেশের অটোমোটিভ শিল্পে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে হিরো মটোকর্প।
Visit tr-sport.bond for more information.
স্বপ্নদ্রষ্টা নেতৃত্ব ও অংশীদারত্বের শক্তি
হিরো মটোকর্পের এই সাফল্যের মূলে রয়েছেন এর এক্সিকিউটিভ চেয়ারম্যান ড. পবন মুঞ্জাল। তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্বে টানা ২৩ বছর ধরে হিরো বিশ্বের অন্যতম সেরা মোটরসাইকেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃত। ২০১১ সালে এককভাবে যাত্রা শুরুর পর থেকে বিশ্বজুড়ে ১৩ কোটির বেশি গ্রাহকের হৃদয় জয় করেছে এই ব্র্যান্ড।
বাংলাদেশে এই যাত্রার প্রধান সারথি নিটল নিলয় গ্রুপ। গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল মুসাব্বির আহমদের দক্ষ নেতৃত্বে ২০১৪ সালের জুনে এইচএমসিএল নিলয় বাংলাদেশ লিমিটেড যাত্রা শুরু করে। এই যৌথ উদ্যোগে হিরো মটোকর্পের ৫৫ শতাংশ এবং নিলয় মটরসের ৪৫ শতাংশ মালিকানা রয়েছে। কেবল আমদানিনির্ভরতা কাটিয়ে দেশেই মোটরসাইকেল তৈরির লক্ষ্য নিয়ে শুরু হওয়া এই অংশীদারত্ব আজ বাংলাদেশের শিল্পায়নের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
যশোরের সেই অত্যাধুনিক কারখানা
যশোরের অভয়নগরে ২০ একর জমির ওপর গড়ে তোলা হয়েছে হিরোর অত্যাধুনিক উৎপাদন কারখানা। শুরুতে ১২ একরে যাত্রা করলেও চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে এর পরিধি বাড়ানো হয়েছে। বছরে ২ লাখ ৫০ হাজার মোটরসাইকেল তৈরির ক্ষমতাসম্পন্ন এই কারখানায় রয়েছে রোবোটিক ওয়েল্ডিং লাইন, যা ফ্রেম এবং সুইং আর্ম তৈরিতে নিখুঁত মান নিশ্চিত করে। জার্মানি থেকে আনা ডুয়াল পেইন্ট শপ এবং দেশের অন্যতম দীর্ঘ অ্যাসেম্বলি লাইন এই কারখানাকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
বিস্ময়কর বিষয় হলো, এই বিশাল কারখানাটি কেবল একটি শিল্প ইউনিট নয়; এটি একটি পরিবেশবান্ধব ‘গার্ডেন ফ্যাক্টরি’। এখানে জিরো ওয়াটার ডিসচার্জ পলিসি অনুসরণ করা হয়। ইটিপি ও এসটিপি প্ল্যান্টের মাধ্যমে শোধিত পানি ব্যবহার করে কারখানার ভেতরেই ফল ও সবজির বাগান করা হয়েছে, যা কারখানার ক্যানটিনের চাহিদা মেটায়। এ ছাড়া ২০২৪ সালে এখানে ১ দশমিক ৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প চালু করা হয়েছে। কারখানার নিজস্ব চাহিদা মিটিয়ে উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে, যা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় অবদান রাখছে।
প্রযুক্তির উদ্ভাবন ও গ্রাহক সন্তুষ্টি
হিরো সব সময়ই সাধারণ মানুষের সাধ্যের মধ্যে আধুনিক প্রযুক্তি পৌঁছে দিতে কাজ করে। ১০০ সিসি ক্যাটাগরিতে প্রথম ডিস্ক ব্রেক কিংবা জ্বালানি সাশ্রয়ী ‘আই৩ এস’ (আইডল স্টপ-স্টার্ট সিস্টেম) প্রযুক্তির প্রচলন করেছে হিরো। আইথ্রিএস প্রযুক্তি জ্যামে থাকা অবস্থায় ইঞ্জিন স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ করে দেয় এবং থ্রটল চাপলেই আবার চালু হয়, যা তেল সাশ্রয়ে অভাবনীয় ভূমিকা রাখে।
এ ছাড়া ক্রুজ কন্ট্রোল, রাইডিং মোড, প্যানিক ব্রেক অ্যালার্ট এবং ১২৫ সিসি সেগমেন্টে এবিএস ব্রেকিং সিস্টেমের মতো প্রিমিয়াম ফিচারগুলো এখন সাধারণ বাইকারদের হাতের নাগালে। গ্রাহকদের ওপর অগাধ আস্থা থেকেই হিরো বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড হিসেবে ৫ বছরের ওয়ারেন্টি সুবিধা চালু করেছে।
বাজারের ঘুরে দাঁড়ানো ও সম্ভাবনা
কোভিড-পরবর্তী সময়ে দেশের মোটরসাইকেল বাজার কিছুটা সংকুচিত হয়েছিল। ২০২০ সালে যেখানে বার্ষিক চাহিদা ছিল ৬ লাখ ইউনিট, ২০২৪ সালে তা কমে ৪ লাখের নিচে নেমে আসে। তবে ২০২৫ সালে বাজারে দারুণ এক ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেছে। গত বছর বাজার প্রায় ১৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৪ লাখ ৬৬ হাজার ইউনিটে পৌঁছেছে। এই উত্তরণ পর্বে হিরো মটোকর্পের বাজার অংশীদারত্ব এখন ২১ দশমিক ৮ শতাংশ, যা তাদের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তারই প্রমাণ। এ পর্যন্ত বাংলাদেশে ১০ লাখের বেশি গ্রাহক হিরোর সেবা গ্রহণ করেছেন।
দেশি মেধার ক্ষমতায়ন
একসময় এই খাতের কারিগরি দিকগুলো বিদেশি প্রকৌশলীরা দেখাশোনা করলেও, ২০২৩ সাল থেকে এইচএমসিএল নিলয় পুরোপুরি বাংলাদেশি মেধায় পরিচালিত হচ্ছে। বর্তমানে এখানে ২০ জনের বেশি দক্ষ প্রকৌশলী এবং ৫০ জনের বেশি ডিপ্লোমা প্রকৌশলী কাজ করছেন। নির্বাচিত প্রকৌশলীদের হিরোর বিশ্বমানের ল্যাবে উচ্চতর প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে, যা বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের কারিগরি দক্ষতা বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখছে।
নীতিমালা ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশের মোটরসাইকেল শিল্প এখন দেশের অর্থনীতিতে বছরে ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি অবদান রাখছে এবং প্রায় ৫ লাখ মানুষের জীবিকা এই খাতের সঙ্গে জড়িত। তবে শিল্প–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন, ভ্যাট, শুল্ক এবং উচ্চ নিবন্ধন ফির কারণে মোটরসাইকেলের দাম সাধারণের নাগালে আনতে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে। ১ লাখ ৬৫ হাজার টাকার একটি বাইকে গ্রাহককে প্রায় ৫০ হাজার টাকার বেশি ট্যাক্স ও ফি দিতে হয়।
ভারতের উদাহরণ টেনে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সেখানে ভ্যাট বা জিএসটি ১০ শতাংশ কমানোর ফলে বিক্রি ২৫ শতাংশ বেড়েছিল। বাংলাদেশেও যদি ভ্যাট ও নিবন্ধন খরচ যৌক্তিক পর্যায়ে আনা হয়, তবে মোটরসাইকেল বিক্রির সংখ্যা দ্বিগুণ হতে পারে, যা পরোক্ষভাবে সরকারের রাজস্ব আরও বাড়িয়ে দেবে। বর্তমানে এই শিল্প তার মোট উৎপাদন ক্ষমতার মাত্র ৩০-৪০ শতাংশ ব্যবহার করছে। সঠিক নীতি সহায়তা পেলে এই খাত জিডিপিতে বিশাল অবদান রাখতে সক্ষম।
আইকনিক মডেল ও আস্থা
হিরোর সাফল্যের মুকুটে সবচেয়ে উজ্জ্বল পালক হলো তাদের আইকনিক মডেলগুলো। বিশ্বজুড়ে সমাদৃত ‘স্প্লেন্ডার’ আজ কেবল একটি মোটরসাইকেল নয়, বরং স্থায়িত্ব এবং নির্ভরযোগ্যতার এক বৈশ্বিক মানদণ্ড। এই একটি মডেলই বিশ্বজুড়ে ৪ কোটির বেশি বিক্রি হয়েছে। এ ছাড়া এইচএফ ডিলাক্স, গ্ল্যামার, হাঙ্ক এবং প্লেজারের মতো মডেলগুলো বাংলাদেশের প্রতিটি ঘরে ঘরে হিরো আস্থায় পৌঁছে দিয়েছে। বর্তমানে বিশ্বের ৫১টি দেশে হিরোর উপস্থিতি তাদের ক্রমবর্ধমান বিশ্বস্ততারই প্রমাণ দেয়।
বাংলাদেশে হিরোর দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য ও রূপান্তর
২০১৩ সালে যখন নিলয় মটরসের সঙ্গে হিরোর চুক্তি হয়, তখন লক্ষ্য ছিল কেবল ব্যবসা নয়, বরং বাংলাদেশের তরুণদের মধ্যে উন্নত প্রযুক্তির জ্ঞান স্থানান্তর করা। সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে ২০১৭ সালে বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ৮ লাখের বেশি মোটরসাইকেল স্থানীয়ভাবে বিক্রি হয়েছে। ২০১৪ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ১০ লাখের বেশি বাংলাদেশি হিরোর পণ্য ও সেবার অভিজ্ঞতা নিয়েছেন। এই রূপান্তরের বড় সাফল্য হলো উন্নত মানের বিক্রয়োত্তর সেবা নিশ্চিত করা এবং প্রতিটি বাইকের জন্য সাশ্রয়ী মূল্য বজায় রাখা।
নিরাপত্তা ও প্রযুক্তির সমন্বয়
আধুনিক বাইকারদের নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করতে হিরো ধারাবাহিকভাবে নতুন নতুন প্রযুক্তি যুক্ত করছে। যেমন বাইক চালানো অবস্থায় হুট করে ব্রেক করলে সতর্কসংকেত দেওয়ার জন্য ‘প্যানিক ব্রেক অ্যালার্ট’, দীর্ঘ পথে ক্লান্তিহীন ড্রাইভিংয়ের জন্য ‘ক্রুজ কন্ট্রোল সিস্টেম’ এবং সাইড স্ট্যান্ড খোলা থাকলে ইঞ্জিন স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হওয়ার মতো বিশেষ সুরক্ষা ব্যবস্থা। এ ছাড়া ১২৫ সিসি সেগমেন্টে হিরো নিয়ে এসেছে বাটারফ্লাই টাইপ থ্রটল বডি, যা পিস্টন টাইপ থ্রটল বডির চেয়ে অনেক বেশি জ্বালানি সাশ্রয়ী। এলইডি লাইট প্যাকেজ এবং আকর্ষণীয় ডিজাইন তরুণ প্রজন্মের ক্রেতাদের হিরোর দিকে দারুণভাবে আকৃষ্ট করছে।
দেশের বৃহত্তম সেবা নেটওয়ার্ক
হিরো বিশ্বাস করে, গাড়ি কেনার পর প্রকৃত সম্পর্ক শুরু হয় সেবার মাধ্যমে। এই উদ্দেশ্যেই তারা বাংলাদেশে গড়ে তুলেছে দেশের বৃহত্তম সেবা নেটওয়ার্ক। বর্তমানে দেশজুড়ে ২০০ টির বেশি ‘থ্রি-এস’ (সেলস, সার্ভিস ও স্পেয়ার পার্টস) সেন্টার রয়েছে, যেখানে একই ছাদের নিচে কেনা, মেরামত এবং আসল যন্ত্রাংশ পাওয়া যায়। এ ছাড়া ৫০টি নিবেদিত ‘টু-এস’ আউটলেট এবং ৩৫০টি ‘ওয়ান-এস’ সার্ভিস সেন্টার শহর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রাম অঞ্চলেও ছড়িয়ে আছে। এই সুবিস্তৃত নেটওয়ার্কের কারণে হিরোর গ্রাহকদের পার্টস বা মেকানিকের জন্য দুশ্চিন্তা করতে হয় না।
অর্থনীতিতে অবদান ও আগামীর সম্ভাবনা
বাংলাদেশের অটোমোটিভ শিল্প আজ কেবল একটি শৌখিন খাত নয়, এটি জাতীয় অর্থনীতির মেরুদণ্ড হয়ে উঠছে। বর্তমানে দেশের জিডিপিতে এই খাতের অবদান ১ শতাংশের কম হলেও, ভারতে এটি প্রায় ৮ শতাংশ। হিরোর মতো বড় বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলো মনে করে, যদি ভ্যাট ও নিবন্ধন খরচ কমানো যায়, তবে এই খাতের অবদান কয়েক গুণ বেড়ে যাবে। বর্তমানে কারখানাগুলো তাদের পূর্ণ ক্ষমতার মাত্র ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ ব্যবহার করছে। একটি সঠিক ও দীর্ঘমেয়াদি সরকারি নীতি সহায়তা পেলে এই খাত তৈরি পোশাকশিল্পের মতো বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকা শক্তিতে পরিণত হতে পারে।
উন্নয়নের অংশীদার
এইচএমসিএল নিলয় বাংলাদেশের এই যাত্রা কেবল একটি বাণিজ্যিক উদ্যোগ নয়; এটি শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং প্রযুক্তির আধুনিকায়নের এক সম্মিলিত প্রচেষ্টা। স্থানীয় দক্ষ জনবল আর আন্তর্জাতিক প্রযুক্তির মেলবন্ধনে হিরো মটোকর্প আজ বাংলাদেশের মানুষের যাতায়াতের অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী। ‘হিরোর দেশ, বাংলাদেশ’—এই চেতনা নিয়ে তারা প্রতিটি কর্মদিবসে নতুন আগামীর স্বপ্ন বুনে চলেছে।