ঠাকুরগাঁওয়ে লিচুগাছে মুকুল কম, নতুন পাতা বেশি, ফলন নিয়ে শঙ্কা
· Prothom Alo

গ্রামের রাস্তাগুলো এঁকেবেঁকে চলে গেছে দূরদূরান্তে। দুই পাশে সারি সারি লিচুগাছ। গাছে গাছে সবুজ আর তামাটে পাতায় ভরা। কোথাও কোথাও পাতার ফাঁকে ফাঁকে দুলছে লিচুর মুকুল।
সাধারণত মাঘের শেষ থেকে ফাল্গুনের মাঝামাঝি লিচুগাছে মুকুল আসতে থাকে। গাছে মুকুল বেশি হলে, চাষিদের মুখে হাসিও দীর্ঘ হয়। মুকুলে ভরা গাছের পরিচর্যায় মেতে ওঠেন তাঁরা। পাশাপাশি মুকুল দেখে গাছ কিনে নেন লিচু ব্যবসায়ীরা।
Visit catcross.biz for more information.
এবার ঠাকুরগাঁওয়ের লিচুবাগানে মুকুলের বদলে অধিকাংশ গাছে দেখা যাচ্ছে নতুন পাতা। যেসব গাছে মুকুল এসেছে, তাতেও কচিপাতার আধিক্য। লিচুচাষিরা বলছেন, যে গাছে নতুন পাতা বের হয়, সে গাছে ফলন পাওয়া যায় না। তাই এবার লিচুর ফলন কম হওয়ার আশঙ্কা করছেন তাঁরা।
এ জেলায় চায়না থ্রি, বোম্বাই, মাদ্রাজি, কাঁঠালি, গোলাপি জাতের লিচুর চাষ হয়। লিচু চাষের জন্য উপযোগী বেলে-দোআঁশ মাটি হওয়ায় এ অঞ্চলে লিচু চাষে কৃষকের আগ্রহও বাড়ছে দিন দিন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ঠাকুরগাঁও কার্যালয় সূত্র জানায়, জেলায় ২৮১ হেক্টর জমিতে ৬৪১টি লিচুবাগান রয়েছে। এ ছাড়া বসতবাড়িতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে লিচুগাছ। এবার লিচু উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১ হাজার ৩১৬ মেট্রিক টন।
ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার গোবিন্দনগর ও আকচা এলাকার কয়েকটি লিচুবাগানে গিয়ে দেখা যায়, গাছে গাছে তামাটে রঙের নতুন পাতা ভরা। কোনো কোনো গাছে তামাটে পাতার ফাঁকে উঁকি দিচ্ছে মুকুল।
গোবিন্দনগর এলাকার সতীশ বর্মণের লিচুবাগানে গোলাপি জাতের ২৫০টি গাছ রয়েছে। সোমবার সকাল ১০টার দিকে দেখা গেল, তিনি বাগানে দাঁড়িয়ে আছেন। কাছে যেতেই সতীশ বললেন, প্রতিবছর কমবেশি সব গাছে মুকুল আসে। এ বছর ৫০টি গাছেও মুকুল আসেনি। প্রায় সব গাছ নতুন পাতায় ভরে গেছে। গাছে গাছে নতুন পাতা আসায় এবার লিচুর ফলনের তেমন আশা নেই। তবে কী কারণে মুকুলের বদলে লিচুগাছে নতুন পাতা এসেছে, তার সুনির্দিষ্ট কারণ জানা নেই সতীশের।
পাশে আবদুস সালামের বাগান; ১৫৬টি লিচুগাছ আছে। তাঁর বাগানেরও অধিকাংশ গাছে নতুন পাতা এসেছে; মুকুল নেই। তারপরও তিনি গাছের যত্ন নিচ্ছেন। সালাম বললেন, ‘গাছের যত্ন করতেছি। দেখি, যদি মুকুল আসে। মুকুল তো আসার সময় এখনো আছে।’ তিনি জানান, গাছে যদি নতুন পাতা ও মুকুল একই সঙ্গে বের হয়, তাহলে সেই ফলের আকার বড় হয় এবং সহজে রোগবালাই হয় না।
আকচা গ্রামের লিচুচাষি আহসান হাবিবের বাগানের একই অবস্থা। তিনি বললেন, গত বছর বাগানের প্রায় সব গাছে মুকুল এসেছিল। লিচুর ফলনও ভালো ছিল। এবার তাড়াতাড়ি সবুজ ও তামাটে পাতা ছেড়ে দিয়েছে গাছগুলো। কিছু ডালে মুকুল থাকলেও পাতার পরিমাণই বেশি।
নারগুন এলাকার কৃষক জাহাঙ্গীর আলম বললেন, গাছে যদি নতুন পাতা আসে, তাহলে মুকুল কম আসে। আর মুকুল না এলে ফল তো পাওয়া যায় না। তাঁর বাগানে দেখা মেলে ফেনীর দাগনভূঞা উপজেলার ফল ব্যবসায়ী নুর ইসলামের। তিনি গাছের মুকুল দেখেই প্রতিবছর এই এলাকার লিচুবাগান কিনে নেন। নুর ইসলাম জানালেন, যখন লিচুগাছে মুকুল দেখা দেয়, তখন তাঁরা বাগান ঘুরে ঘুরে মুকুল দেখেন, আর অনুমান করেন লিচুর ফলনের। পছন্দ হলে বাগানমালিকের কাছ থেকে বাগান কিনে পরিচর্যা শুরু করে দেন। এরপর লিচু পাকলে বিক্রি করে দেন দেশের বিভিন্ন এলাকার পাইকারের কাছে।
জেলায় ২৮১ হেক্টর জমিতে ৬৪১টি লিচুবাগান রয়েছে। এ ছাড়া বসতবাড়িতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে লিচুগাছ। এবার লিচু উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১ হাজার ৩১৬ মেট্রিক টন।
নুর ইসলাম বলেন, গত বছরের তুলনায় এবার বাগানের দাম প্রায় দ্বিগুণ। এ বছর ২০০ লিচু গাছ তাঁকে কিনতে হয়েছে প্রায় পাঁচ লাখ টাকায়। গত বছর ১০০ গাছ কিনতে খরচ হয়েছিল প্রায় দেড় লাখ টাকা। এ বছর বেশির ভাগ গাছে মুকুল না আসায় মুকুলসহ গাছের দাম বেড়ে গেছে। এতে এবার লিচুরও দাম বেশি পড়বে।
ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক শিক্ষক নাসরীন জাহান বলেন, লিচুগাছে সমানভাবে প্রতিবছর মুকুল আসে না। কখনো বেশি, কখনো কম হয়। তবে এবার তুলনামূলকভাবে কমসংখ্যক গাছে মুকুল এসেছে। এটি প্রাকৃতিক কারণে হতে পারে। তা ছাড়া এবার শীতটাও একটু কম ছিল। অন্যদিকে মুকুলের গুটি শক্ত হওয়ার আগে সেচ দেওয়া হলে ফ্লাওয়ারিং হরমোন কম হবে, বৃদ্ধিজনিত হরমোন বেশি হবে। মূলত হরমোনের অসামঞ্জস্যতার কারণে গাছে মুকুলের বদলে সবুজ কচি পাতা দেখা দেয়।
তবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর দিনাজপুরের হর্টিকালচার সেন্টারের উদ্যানতত্ত্ববিদ মাসকুরা খাতুন বললেন, মুকুল আসার সময় গাছের গোড়ায় সেচ ও সার দেওয়া হলে গাছে কচিপাতা আসে। কচিপাতা এলে গাছে আর মুকুল আসে না। মুকুল আসার দেড়-দুই মাস আগে থেকে লিচুগাছে সার ও পানি দেওয়া বন্ধ করে দিতে হবে।